চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতেই মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজুকে হত্যা করা হয়েছে। এক মিনিটে হত্যাকাণ্ডের মিশন শেষ করেছে সন্ত্রাসীরা। ৬ সেকেন্ডে ৪ রাউন্ড গুলি করে তারা।
নগরীতে রাজু বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদের শহীদ মিনার কলোনিতে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় রেশমি আক্তার নামে এগারো বছরের এক শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাজুকে হত্যা করা হয়েছে। তার বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নে। তার বাবার নাম আবুল কালাম। শুক্রবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়নি।
জানা গেছে, রাজু কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকার আলোচিত যুবদলকর্মী নাসির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশের ধারণা, নাসির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই প্রতিপক্ষ রাজুকে হত্যা করেছে। ২৬ এপ্রিল রাউজানে যুবদলকর্মী নাসিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নাসিরকে যে কজন সন্ত্রাসী ঘিরে ধরে গুলি করে তার মধ্যে রাজুও ছিলেন। নিহত নাসিরের বোন ও ভাই প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে ঘটনার পরপরই এমন তথ্য জানায়।
যে কারণে রাজুকে মামলার আসামি করা হয়। যুবদলকর্মী নাসির রাউজানে বিএনপির সংসদ-সদস্য (এমপি) গিয়াসউদ্দিন কাদেরের অনুসারী ছিলেন।
১ মিনিটে হত্যাকাণ্ড : রাজু রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে বোনের বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। কল পেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গলির মুখে আসার পরপরই মুখোশ পরা ৩-৪ যুবক তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রাতে হঠাৎ একদল দুর্বৃত্ত শহীদ মিনার কলোনির প্রবেশমুখে এসে রাজুকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় জীবন বাঁচাতে সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গুলিতে তার পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এদিকে সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে সেখানে থাকা একটি মেয়ে শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। সে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এদিকে গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে তারা শব্দটিকে আতশবাজি কিংবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আওয়াজ মনে করেছিলেন। পরে বাইরে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় রাজু ও গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখেন।
৬ সেকেন্ডে ৪ রাউন্ড গুলি করে সন্ত্রাসীরা : রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মিনার কলোনিতে লাগানো একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রাতে বাতির আলোতে ৩-৪ দুর্বৃত্ত দৌড়াচ্ছে আর গুলি করছে। ফুটেজটিতে ৬ সেকেন্ডে ৪ রাউন্ড গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। শুক্রবার দুপুরে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘটনাস্থল বা শহীদ মিনার কলোনিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলছে না এলাকার বাসিন্দারা। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কলোনিটির গুলি করার স্থানে রক্তের দাগ অনেকটা শুকিয়ে গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত শুরু করেছে। তারা ঘটনাস্থল ও আশপাশের একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। এখন সংগ্রহ করা ফুটেজ বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। দুপুরে চমেক হাসপাতাল মর্গের পাশে কথা হয় খুনের শিকার রাজুর যমজ ভাই মোহাম্মদ হোসেন সাজুর সঙ্গে।
তিনি বলেন, রাজু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি শহরে দিনমজুরের কাজ করতেন। তার কোনো শত্রুও ছিল না। রাজু যুবদলকর্মী নাসির হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন সাজু। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার বিকালে রাজুর লাশ রাউজানে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় মামলা করবেন বলে জানান সাজু।
সিএমপি (উত্তর) বিভাগের ডিসি আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাউজান উপজেলার অপরাধের রেশ আমাদের মেট্রো (মহানগর) এলাকায় এসে পড়েছে। আমরা সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছি। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আমাদের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যায় । গত ২২ মাসে সেখানে অন্তত ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। রাজু হত্যাকাণ্ডও এর ধারাবাহিকতা বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
[টিবিএন৭১/আরএন]