ইমনের নির্দেশনায় শ্যালক শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন খুন

এবার প্রকাশ্যে খুন হলেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের (ক্যাপ্টেন ইমন) শ্যালক। নিজ ভগ্নিপতি ক্যাপ্টেন ইমনের নির্দেশনায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে তাঁর নাম ছিল। পুলিশের ধারণা, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যকার অন্তঃকোন্দলে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। দুটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন কনডেন্সেলে বন্দি ছিলেন টিটন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপর থেকেই আত্মগোপনে চলে যায় নিহত টিটন। তখন থেকেই ক্যাপ্টেন ইমনের টার্গেটে পরিণত হন তিনি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ঘোষণা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন ইমন নয়তো টিটনকে দুনিয়া থেকে সরে যেতে হবে।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম জানান, নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদ টিটন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের অভিযান শুরু হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর বাইরে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

ঘটনার বিষয়ে নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোল্লা শাহাদাত বলেন, রাত পৌনে আটটার দিকে মোটরসাইকেলে এসে কয়েকজন দুর্বৃত্ত এক যুবককে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। খুব কাছ থেকে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ থেকে ছয়টি গুলি করে। এরপর দ্রুততম সময়ে পালিয়ে যায় তারা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পথচারীরা তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যার নেপথ্যে ছিলেন নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন।

পুলিশ জানায়, টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন এবং ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিটন তাঁর অপরাধ কার্যক্রম বিস্তৃত করেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। টিটন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।

২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নাঈম আহমেদ টিটনের জন্ম ১৯৬৬ সালে। তাঁর বাবার নাম কে এম ফখরুদ্দিন ও মায়ের নাম আকলিমা বেগম।

অপরাধ জগতে উত্থান ও পারিবারিক সিন্ডিকেট উত্থান: ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউ মার্কেট এলাকায় টিটন এবং তাঁর ভাইদের রাজত্ব শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন (ক্যাপ্টেন ইমন) টিটনের বোন শাহনাজ পারভীন লিনাকে বিয়ে করেন। এর ফলে টিটন, তাঁর ভাই মামুন এবং কিলার রসু মিলে একটি শক্তিশালী পারিবারিক অপরাধী বলয় তৈরি করেন।

সন্ত্রাসী তালিকা: ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার তাঁকে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ২ নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করে।
গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ:  ২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে পুলিশ টিটনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে একটি অবৈধ পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছিল।

মৃত্যুদণ্ড (২০১৪): দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাঞ্চল্যকর বাবর এলাহী হত্যা মামলায় আদালত টিটনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেন। এরপর থেকে তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি ছিলেন।

কারামুক্তি ও দেশত্যাগের ব্যর্থ চেষ্টা: ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১৩ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি জেল থেকে জামিনে মুক্তি পান টিটন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর টিটন বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর জীবন ঝুঁকিতে আছে। তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর কারাগারে থাকায় তাঁর কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছিল না। এনআইডি করতে না পারার কারণে তিনি পাসপোর্ট তৈরি করতে পারেননি এবং বৈধ পথে দেশত্যাগে ব্যর্থ হন। পাসপোর্ট করতে ব্যর্থ হয়ে তিনি নিউ মার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ‘লাপাত্তা’ হয়ে আত্মগোপন করেন।

ভাই হত্যা:  ইমনের সাথে চিরস্থায়ী শত্রুতা ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত টিটন ও তাঁর ভগ্নিপতি ইমনের সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল রক্তক্ষয়ী। টিটনের আপন ভাই টুটুলকে ইতিপূর্বে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন ক্যাপ্টেন ইমন। ভাইয়ের এই করুণ মৃত্যু টিটন ও ইমনের আত্মীয়তার সম্পর্কে চির ধরিয়ে দেয় এবং তাদের মধ্যে আজীবনের শত্রুতা তৈরি করে।
আধিপত্যের লড়াই: ২০২৪-এর পর উভয়ই কারাগারের বাইরে চলে এলে এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত চরমে পৌঁছায়। ইমন মনে করতেন টিটন বেঁচে থাকলে তাঁর একক আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে।

শেষ পরিণতি: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ (হত্যাকাণ্ড)। নিউ মার্কেটের বটতলা এলাকা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনের রাস্তা)। আজ রাত ৮টার দিকে মাস্ক ও ক্যাপ পরিহিত দুই জন মোটরসাইকেলে এসে টিটনকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে অন্তত ৫ রাউন্ড অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

টিটনের মাথায় ও বগলে মারাত্মক জখম হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘাতকরা জনতাকে ভয় দেখাতে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে পারে ক্যাপ্টেন ইমনের ডান হাত তপন সানি। ইজাজ ওরফে হেজাজ মারা যাওয়ার পর সানি একখন ক্যাপ্টেন ইমনের গ্রুপের মূল ভূমিকায় আছে।



[টিবিএন৭১/আরএন]