সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানের ক্ষেত। দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকা ও আধাপাকা ধান রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে কৃষকদের জন্য। তারা বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
কৃষকরা জানান, কয়েকদিন আগেও যে জমিতে ধান কাটার উৎসব চলছিল, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানি। শ্রমিক ও তেল সংকটের কারণে হারভেস্টার মেশিনে চালাতে না পারায় ধান কাটার গতি কম ছিল। এরই মধ্যে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পানি আরো বাড়তে পারে। এতে হাওরের জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন কৃষক পরিবারগুলো। প্রায় বুক সমান পানিতে নেমে তীব্র পরিশ্রম করে তারা যতটুকু পারছেন ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ডুবে থাকা ধান কেটে নৌকা বা ভেলায় করে ঘরে আনতে হচ্ছে, যা এই মূহুর্তে হাওরের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও শেষ সম্বল রক্ষায় কোনো ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছেন না কৃষকরা।
শাল্লা উপজেলা কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন “হাওরে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটতেছি, যা পারি তা বাঁচানোর চেষ্টা করছি। এত কষ্ট করে ফলানো ফসল চোখের সামনে নষ্ট হইতেছে।”
সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার জয়নাল মিয়া বলেন, “হাওরের পানির নিচের ধান কাটছি ঠিক, কিন্তু ভেজা ধান ঘরে তুলে শুকানোর উপায় নাই। রোদ না উঠলে ধান পচে যাবে। এখন রোদ না উঠলে আমরা একদম দিশেহারা।”
সদর উপজেলার জাওয়ার হাওরের কৃষক বলেন, “একদিকে বজ্রপাত, অন্যদিকে বৃষ্টি, আমাদের সব শেষ। তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পানিতে নেমে ধান কাটছি। না কাটলে আমাদের আর কিছুই থাকবে না, তাই যত কষ্টই হোক এই ধানই আমাদের সারা বছরের ভরসা, তাই সব ঝুঁকি নিয়া হাওরে।”
একই হাওরের কৃষক মন্নান আলী বলেন, “যা পাই তাই তুলার চেষ্টা করছি, অনেক টাকা ঋণে এবার ক্ষেত করছিলাম। নেই শ্রমিক, নেই মেশিন এরই মধ্যে নতুন ভোগান্তি কিতা যে করতাম বুঝরাম না। এখন সরকারি সহায়তা ছাড়া চলতে পারব না।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, জেলায় এবার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “আমরা মঙ্গলবার থেকে মাঠে রয়েছি। কোনো বাঁধে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “যেসব জমিতে ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তোলার জন্য আমরা কৃষকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সামনে নদ-নদীর পানি আরো বাড়তে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসও অনুকূলে নেই, তাই দেরি না করে ফসল সংগ্রহ করা জরুরি।”
সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষায় এবার ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে পাউবো। আগাম বন্যার কবল থেকে বাঁধের সুরক্ষা দিতে দিনরাত বাঁধ পাহারা দিতে পিআইসিদের নির্দেশনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. মিনহাজুর রহমান।
[টিবিএন৭১/আরএন]