শত কোটি টাকার স্টেশনে থামে মাত্র একটি ট্রেন!

প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক রেলস্টেশন। কিন্তু বাস্তবে সারাদিনে সেখানে থামে মাত্র একটি ট্রেন। ব্যবহারের অভাবে বিলাসবহুল গাজীপুরের হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশনটি এখন রেলকর্মীদের বসবাসের জায়গায় পরিণত হয়েছে। খোদ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষই বলছে, অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে স্টেশনটি থেকে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

গাজীপুরের হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশন ভবন; নির্মাণশৈলী, নান্দনিকতা ও আধুনিকতার দিক থেকে এটি উন্নত বিশ্বের কোনো স্থাপনার মতোই মনে হয়। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেশনটি ২০১৯ সালে চালু করা হয় প্রতিদিন গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার শিল্পাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের ১০-১৫ হাজার যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে পুরো স্টেশনটি এখন প্রায় সুনসান পড়ে আছে।

যাত্রীরা বলছেন, স্টেশনে যাত্রী এলেও ট্রেন না থামায় টিকিটও পাওয়া যায় না। একজন যাত্রী বলেন, ‘আমি টিকিট কাটার জন্য এসেছিলাম, কাউন্টার বন্ধ, আমি ফিরে যাচ্ছি।’
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সারাদিনে মাত্র একটি ট্রেন থামে এবং বরাদ্দ থাকে মাত্র ২২টি টিকিট। ফলে বিলাসবহুল এই স্টেশন কার্যত কোনো কাজে আসছে না, বরং এটি এখন বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
 
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কোনো কাজে আসে না, আমাদের কোনো উপকার হয় না। স্টেশনটা এখন অনেকটা বিনোদন কেন্দ্রের মতো হয়ে গেছে, যেখানে বিকেলে মানুষ ভিড় করে টিকটক ভিডিও বানায়।
 
কাজে না লাগায় আধুনিক টিকিট কাউন্টার, ভিআইপি বিশ্রামাগার, উন্নত সিগন্যাল কক্ষ ও রিলে রুমে এখন রেলের মাঠকর্মীরা বসবাস করছেন। দায়িত্বশীলরা জানান, স্টেশনটির মাসিক পরিচালন ব্যয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা হলেও কোনো আয় নেই। রেলকর্মীরা বলেন, যন্ত্রপাতি ঠিক থাকলেও ট্রেন না থামায় সেগুলো ব্যবহারহীন পড়ে আছে।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম জানান, ঢাকা অভিমুখী প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন একটি লেভেল ক্রসিং গেট এবং টাঙ্গাইল প্রান্তে একটি ছোট ব্রিজ থাকায় প্রয়োজনীয় ‘ক্লিয়ারিং স্ট্যান্ডিং লেংথ’ রাখা সম্ভব হয়নি।
 
এদিকে এটিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় বলে উল্লেখ করে রেলের অনিয়ম রোধে সরকারকে এখন থেকেই নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, সরকারকে মূল্যায়ন করতে হবে কেন এমন ভুল হলো। না হলে জনগণের অর্থ অপচয় এবং ঋণগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এভাবে চলতে পারে না।
 
অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ হলেও গত ১২ বছরে শতাধিক লোকাল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সারাদেশে ১৩০টি প্রয়োজনীয় স্টেশন বন্ধ রয়েছে। তবুও সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ না নিয়ে বিপুল অর্থে এমন বিলাসবহুল স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা বাস্তবে ব্যবহার হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণেই রেলওয়ে ক্রমেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।



[টিবিএন৭১/আরএন]