রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর: পুনর্বাসন-বিচার কোনোটাই মেলেনি

ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও পুনর্বাসন বা বিচার কোনোটিই পাননি শ্রমিকরা। প্রায় এক যুগ পরে এসে এখনও তাদের চাওয়া- পুনর্বাসন ও ওই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার।

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আটতলা বিশিষ্ট রানা প্লাজা ধসে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই ভবনে থাকা কয়েকটি পোশাক কারখানার ৫ হাজারের মতো শ্রমিক ভবন ধসের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের তার নিচে চাপা পড়েন।

কয়েকদিনের উদ্ধার তৎপরতায় ১ হাজার ১৩৬ জনের লাশ তুলে আনা হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তার মধ্যে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক আহত ও পঙ্গু হন।

ওই সময় জানা গিয়েছিল, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টায় সাভারের রানা প্লাজা ভবনের তৃতীয় তলায় পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। খবর পেয়ে বিজিএমইএ কর্মকর্তারা রানা প্লাজায় আসেন। তারা ওই ভবনের গার্মেন্টস মালিকদের পরামর্শ দেন- বুয়েটের ভবন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা পর্যন্ত সব কার্যক্রম যেন বন্ধ রাখা হয়।

তবে পাঁচ গার্মেন্টস মালিক এবং তাদের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে পরদিন (২৪ এপ্রিল) শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এর সঙ্গে যোগ দেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক খালেক ও সোহেল রানা। পরে এ দিনই (২৪ এপ্রিল) ধসে পড়ে রানা প্লাজা।

ওই ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দায়ের করা এসব মামলার বিচার চলছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে, প্রায় ১৩ বছর ধরে পঙ্গুত্ব নিয়ে এখনও অনেকেই বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছেন।

এমন ঘটনা নাও ঘটতে পারত

ধসের একদিন আগেই ভবনটির চার ও পাঁচ তলার কয়েকটি পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এ কারণে শ্রমিকরা সড়কে নেমে আসেন। খবর পেয়ে সেখানে গেলে মালিকপক্ষ স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। সাংবাদিকরা তখন যোগাযোগ করেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে খবর প্রকাশ হয় সংবাদমাধ্যমে।

বিকেলের দিকে সাভারের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কবির হোসেন সরদার ভবনের ফাটল পরিদর্শন করেন। এরপর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের বলেন, “এ ফাটলে তেমন কোনো সমস্যা নেই, বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নেই। সামান্য প্লাস্টার উঠে গেছে। সব ঠিক হয়ে যাবে।” 

এরপর ইউএনও চলে যান।

ইউএনওর সেই কথিত আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভবন ধসের সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। প্রাণ হারায় হাজারো শ্রমিক। নড়ে ওঠে বিশ্বের বিবেক। ওই ঘটনার পরেই ইউএনওকে বদলি করে দায় এড়ায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

আহত শ্রমিক, শ্রমিক নেতা ও সুশীল সমাজের দাবি, প্রশাসন যথাযথ তৎপরতা রাখলে হয়তো এমন ঘটনা এড়ানো যেত।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, মৃত লাশের গন্ধের সাক্ষী অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ

ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে একে একে উদ্ধার হতে থাকে জীবিত, আহত, মৃত মানুষের দেহ। আহতদের নেওয়া হয় আশপাশের হাসপাতালে। মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে।

টানা ১৭ দিন ধরে চলা উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হতো ওই মাঠে। লাশের অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা ছুটে আসতেন সাইরেন শুনলেই। এই বুঝি স্বজনের মরদেহ এলো! স্বজনদের আহাজারিতে দিনরাত ভারি হয়ে থাকত অধরচন্দ্র স্কুল মাঠ।


প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের পুরোটা জুড়েই তখন কান্না আর সাইরেনের আওয়াজ। অধরচন্দ্রের মাঠ এখনও বয়ে বেড়ায় সেই স্মৃতি।

ওই সময় স্কুলটিতে পড়তেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, “আগে ক্লাসের বাইরেও প্রচুর ঘুরাফেরা, খেলাধুলা করতাম এই মাঠে। কিন্তু রানা প্লাজার ধসে পড়ার পর মৃত লাশগুলো সারি সারি করে রাখা হয়েছিল এখানে। এখনও গা ছমছম করে ওঠে।”

হতাহত যত

প্রায় ১৭ দিনের উদ্ধার অভিযানে রানা প্লাজার ভবন থেকে ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিককে।

আহতদের অনেকেই এখনও দুর্বিষহ সেইদিনের স্মৃতি বয়ে বেরাচ্ছেন। অনেকেই পঙ্গু। এখনও সেই ভয়াল স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।

শহিদ বেদি এখন ‘প্রতিবাদের প্রতীক’

হতভাগ্য শ্রমিকদের স্মরণে ২০১৩ সালের ২৪ মে রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি শহদ বেদি নির্মাণ করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

অস্থায়ী শহিদ বেদিটির নামকরণ করা হয় ‘প্রতিবাদ-প্রতিরোধ’।

বেদিটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন চালিয়ে আসছে নানা কর্মসূচি। এটি এখন হয়ে উঠেছে ‘প্রতিবাদের প্রতীক’।

এখন যেমন আছে রানা প্লাজার সেই স্থান

ধসের পরপরই প্রায় সব ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এরপর জমিটির চারপাশ কাঁটাতার ও টিনের বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই রানা প্লাজায় আহত, নিহত আর নিখোঁজ স্বজনরা জায়গাটিতে আসতেন। তবে ধীরে ধীরে জায়গাটি পরিণত হয় পরিত্যক্ত ভূমিতে।


বর্তমানে জায়গাটিতে নানা লতাপাতার দখল। সামনে বেদি। ফুটপাত জুড়ে রাখা থাকে রেন্ট-এ কারের গাড়ি। তবে ২৪ এপ্রিল এলে নানা কর্মসূচিতে কিছুটা প্রাণ পায় জায়গাটি।

বিচার পাননি হতভাগ্যরা

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তিনটি মামলার কোনোটিই এখনও শেষ হয়নি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইনের মামলাটি দীর্ঘদিন হাইকোর্টে স্থগিত। এটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগে পুলিশের করা মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। আর ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

এসব দীর্ঘসূত্রিতার হাজারো শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ওই ঘটনায় এখনও বিচার পাননি হতভাগ্যরা।

২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। তবে এ নির্দেশের অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

বাঁচার লড়াই করছেন আহতরা

প্রায় ১৩ বছর ধরে পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচার লড়াই করে যাচ্ছেন অনেকেই। অসুস্থতা আর দারিদ্র্য নিয়ে তাদের দীর্ঘ সংগ্রাম। কেউ তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। শ্রমিক নেতারাও রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ দোষীদের শাস্তি ও শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছেন এতদিন।

চারতলায় একটি কারখানায় কাজ করতেন মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, “২৩ তারিখে আমরা দেখলাম ফাটল দেখা দিয়েছে, তখন আমাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। ২৪ তারিখ সকালে সবাইকে আবার বলা হয় যে ফাটল দেখা গেছে, তাই ঢুকতে হবে না-কিন্তু পরে আমাদের জোর করে কাজের জায়গায় ঢোকানো হয়। আমরা তখন কাজ করছিলাম। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে একটি বড় শব্দ হয়, চারদিক কেঁপে ওঠে। মনে হলো যেন ধান-ধান করে সব ভেঙে পড়ছে। মাথার ওপর ধুলা পড়ে চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। আমি আর কিছু বুঝতে পারিনি কী হয়েছে। এরপর প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন আমি বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পাই। আমার মাথায় আঘাত লেগেছে, বুকে চাপ লেগেছে, কোমরে সমস্যা হয়েছে, হাত কেটে গেছে। পরে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অনেক পরে জ্ঞান ফিরে আসে।”


নিজের দুর্বিষহ অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন আমার অবস্থাটা এমন যে আমি ঠিকমতো কাজ করতে পারি না। ডাক্তার বলেছেন ভারী কোনো কাজ করা যাবে না, এমনকি দুই কেজির বেশি ওজনও তুলতে পারব না। বসে বা টুলে বসে কাজ করতে হবে। মাথার সমস্যাও রয়ে গেছে, সময়ের হিসাবও অনেক সময় গুলিয়ে যায়। আমাদের কিছু সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল। বিকাশে ১৫ হাজার করে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল, পরে আবার কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু তা আমরা হাতে পাইনি। চিকিৎসার সময় বলা হয়েছিল, কিছু টাকা সরকার দিয়েছে, কিন্তু আমরা তার সঠিক হিসাব পাইনি। এখন আমাদের একটাই দাবি- আমরা যেহেতু আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারি না, আমাদের পুনর্বাসন করা হোক। আমাদের এমন কোনো ব্যবস্থা করা হোক যেখানে আমরা কাজ করে খেতে পারি। আমরা বহু বছর ধরে এসব কথা বলছি, বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েছি, কিন্তু আমাদের কথার কোনো সঠিক সাড়া আমরা পাই না।”

রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় প্যান্টম টেক্স লিমিটেডে চাকরি করতেন জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, “আমি রানা প্লাজার পাঁচ তলায় কাজ করতাম। ফ্যাক্টরির নাম প্যান্টম টেক লিমিটেড। ভাঙনের দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমাকে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয়। আমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। এখন আমি অনেক অসুস্থ অবস্থায় আছি। ভাঙনের সময় আমার মাথায় লোহার কিছু পড়ে আঘাত লাগে। এতে মাথার ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। সেই থেকে আমার সারাক্ষণ মাথায় যন্ত্রণা থাকে, অনেক সময় চিৎকার করে উঠি। আমি নিউরোসায়েন্স (পিজি) হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছি, কিন্তু এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। আমার বুকে আঘাত লেগে বাম পাশের ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, জরুরি অপারেশন করতে হবে, কিন্তু অর্থের অভাবে সেটা করতে পারছি না। আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে, কোমর এবং ডান পায়ের হাড়েও সমস্যা আছে। আমি আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না, আধা ঘণ্টা বসে থাকতেও পারি না। খুব কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছি।”


তিনি আরো বলেন, “আমি এখন টানাপোড়েনের মধ্যে বেঁচে আছি। ওষুধ খাচ্ছি, চিকিৎসা চলছে, কিন্তু আগের মতো স্বাভাবিক জীবন আর নেই। মনে হয়, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো ছিল। আমার একটা ১২ বছরের ছেলে আছে। ভাঙনের পর আমাদের কিছু সাহায্য হিসেবে বিকাশে টাকা দেওয়া হয়েছিল- প্রায় ৯৫ হাজার টাকা, কয়েক দফায় ১৫ হাজার করে এবং একবার ৫০০ টাকা। কিন্তু ৫০০ টাকা পরে সরকার কেটে নিয়েছে বলে শুনেছি। আমার স্বামী এখন নিখোঁজ, তার কোনো খোঁজ নেই। আমি এখন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। একবেলা খাই, আরেকবেলা খেতে পারি না। ছেলেকে ভালো খাবার বা ভালো কাপড় দিতে পারি না। ঈদ বা বিশেষ দিনেও কিছু দিতে পারি না। নিজের বাঁচাটাই এখন কঠিন হয়ে গেছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি চিন্তায় আছি। আমি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি-আমাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা আহত হয়েছি তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে। আর আমার ছেলের লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে, যাতে সে মানুষ হিসেবে বড় হতে পারে। আমি নিজে কোনো কাজ করতে পারি না, নিজেই খেতে পারি না। মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হয়। তাই আমার একটাই প্রশ্ন- আমার সন্তানকে কে দেখবে, তাকে কে মানুষ করবে?”

যা বলছেন শ্রমিক নেতারা

রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর প্রায় প্রতিটি শ্রমিক সংগঠনই নড়েচড়ে বসে। শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশ নিরাপদ রাখতে আন্দোলন শুরু করে। নিহত ও আহতদের লস অব আর্নিংয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করেন তারা। ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করার জোর দাবি তোলেন তারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা ঘটে। এতে এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক প্রাণ হারান এবং দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সুচিকিৎসা এখনো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অনেক ভুক্তভোগী এখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত। আমাদের দাবি হলো, অবিলম্বে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনরায় বিস্তারিত মূল্যায়ন বা নিড অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রানা প্লাজার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ভবন মালিক, গার্মেন্টস মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব দায়ী ব্যক্তিদের সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রিয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল আমার চোখের সামনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এই ঘটনায় প্রায় ১ হাাজর ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত হন এবং প্রায় ২ হাজাার ৫০০ জন শ্রমিক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ শ্রমিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত। দুঃখজনকভাবে এই ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনো ১৪ বছরে পদার্পণ করলেও দায়ী ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া আর অধিকাংশ অভিযুক্ত এখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিপূরণ ও বিচার দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে এককালীন আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও, বাস্তবে অনেক ভুক্তভোগী শ্রমিক এখনো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি। কিছু সহায়তা বা অনুদান দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের দাবি হলো- দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রানা প্লাজার সামনে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে, যাতে নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায়। আমরা ২৪ এপ্রিলকে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক শক্তি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানাই। এছাড়া আহত ও নিহত শ্রমিকদের এককালীন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ, পঙ্গুত্ববরণকারীদের আজীবন চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। রানা প্লাজার জায়গাটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে সেখানে শ্রমিকদের স্মৃতিস্তম্ভ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করা হোক-এটাই আমাদের দাবি। বর্তমানে ওই জায়গার অবস্থা অরক্ষিত ও অস্বাস্থ্যকর। আমরা চাই, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জায়গাটি সংরক্ষণ করুক এবং শ্রমিকদের সম্মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করুক।”

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পর শ্রমিকদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো পর্যাপ্ত কি না, এ প্রশ্নে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “পর্যাপ্ততার কোনো ডেফিনেশন নেই, তাই একেবারে সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির জায়গাটাও আপেক্ষিক। রানা প্লাজা ঘটনার সময়ের তুলনায় আজ শ্রমিকদের বেতন, জীবনমান ও সামাজিক সাপোর্ট অনেক বেড়েছে যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে তাদের খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সেই সময়ের তুলনায় গার্মেন্টস শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, প্রতিযোগিতা এবং মুনাফার চাপের কারণে অনেক মালিকও এখন চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছেন।”

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, “শুধু শ্রমিকদের দিক থেকে বিষয়টি দেখা ঠিক নয়, আবার একপাক্ষিকভাবে মালিকদের পক্ষেও অবস্থান নেওয়া উচিত নয়। শ্রমিকদের জীবনমান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি উৎপাদন খরচ, বাজারদর ও রপ্তানি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। একটা সময় টিশার্টের দাম যেমন ছিল, আজও বৈশ্বিক বাজারে সেই দাম কমে গেছে বা স্থবির আছে। অথচ শ্রমিকদের ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে।”

তিনি বলেন, “শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য মালিক, শ্রমিক, সরকার এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা-সব পক্ষের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা প্রয়োজন। বায়ারদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে, সরকারের প্রয়োজন অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং মালিকদেরও লাভজনক অবস্থায় থাকতে হবে, তাহলেই শ্রমিকদের জন্য আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে একপাক্ষিক নয়, বরং ‘ব্যালেন্সিং মাইন্ডসেট’ প্রয়োজন, যেখানে সব পক্ষের স্বার্থ ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে।”




[টিবিএন৭১/আরএন]